গিন্নির সাথে গল্প হাসি ঠাট্টা করতে করতে মাঝে মাঝে বলি যে, 'সত্যি কথা বললে অধিকাংশ লোকই বেজার হয়।' না হলেও কমপক্ষে সেটাকে অন্যভাবে নেয় কিংবা ভুল বুঝে। উদাহরণস্বরূপ, অফিসের বস কোন কাজে ভুল করলে যদি সেটা বিনীতভাবে তাকে জানানো হয় তবে তার অনেক কষ্ট হয় সেটা সংশোধন করতে কিংবা নিদেনপক্ষে তা মেনে নিতে।
এ প্রসঙ্গে একজন সিনিয়র কলিগের একটা মজার মন্তব্য মনে পড়ছে। রসিক কলিগটি আমাদের একটা ক্লাস নেবার সময় বলেছিলেন, ছেলে-মেয়েদের স্বপ্নদোষের ব্যাপারে যদি কেউ জানতে পারে, তবে অধিকাংশ বাবা-মা বা অভিভাবক মনে করে যে, এটা আবার কি অঘটন ঘটল! অথচ এটা যে ছেলে-মেয়েদের শারিরীক সুস্থতার একটা বিরাট প্রমাণ তা বুঝার মত অনুধাবন ক্ষমতা কিংবা মেনে নেয়ার মত মানসিক জোর বেশীর ভাগ লোকেরই থাকে না।
তারই প্রমাণ আরেকবার পেলাম যায় যায় দিনের 'ঈদ সংখ্যা'য় প্রকাশিত আমার লেখাটা ২/১ জন বন্ধু-বান্ধবকে দেখানোর পর। 'ঈদের ১০টি অর্থ' শিরোনামে যে লেখাটি লিখেছিলাম তার প্রথম ৯টি অর্থ পড়ে কোন মন্তব্য না করলেও ১০ম অর্থটার (যেখানে লিখেছিলাম ঈদের একটি অর্থ যায় যায় দিনের বিশেষ সংখ্যা হাতে পাওয়া) ব্যাপারে অফিসের এক কলিগ বলল যে, এটাতে তো যায় যায় দিনকে একদম তেল মেরে দিয়েছি। তখন সেই কথাটাই আবার মনে পড়ল, সত্যি কথা অন্যের উপর কি প্রতিক্রিয়া ফেলে।
এখন ভয় লাগছে যে, যদি এই লেখা প্রকাশ হয় এবং তা যদি ঐ কলিগ পড়ে তখন কেমন হবে। হয়ত বলবে যে, এটা আবার কেন লিখতে গেলাম। সে ঠাট্টা করে ঐ মন্তব্য করেছিল।
যায় যায় দিনে নাম-ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক লেখকের লেখা পড়ে সেই সত্যটারই বার বার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষতঃ হৃদয়ঘটিত বিষয়ে রচনার লেখকের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে না চাওয়ার অন্যতম কারণই হলো সত্যি কথার ব্যাপারে মানুষের প্রতিক্রিয়া। মানুষ পাথর নয়। হৃদয় আছে বলেই সে ভালবাসে। আর সেই ভালবাসার গতি প্রকৃতি আজ অবধি সুনির্দিষ্ট করা মানবজাতির পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। বরং তা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিভিন্ন রূপ লাভ করে তার মহিমা ও আবেদন বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু সমস্যা দাড়ায় তখনি যখন কেউ তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনার সংকীর্ণতার দ্বারা অপর কারো হৃদয়ের মহত্তম আবেগ প্রকাশের বিষয়টিকে বিচার করে। ঠিক-বেঠিক, ন্যায়-অন্যায় ও সামাজিক অনুমোদন, বাধা-নিষেধের মাপকাঠি দাড় করায়।
হয়ত অনেক ভালবাসাই বাস্তবে রূপ লাভ করতে পারে না কিংবা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। তাই বলে যা ঘটে যায় কিংবা হৃদয়ে যে আবেগের উদয় হয়, তাকে অস্বীকার করা অথবা ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠিতে তাকে বিচার করা সম্ভব নয়। সেজন্য সত্যের খাতিরে, ভালবাসা ও প্রিয়জনের স্বার্থে অনেক সময় সত্য গোপন করার প্রয়োজন হয়। গোপনীয়তা রক্ষার পর যেটুকু ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব, যতখানি লেখায় তুলে ধরা যায়, সেটুকুই সাহিত্যের লাভ। কারণ Truth is stranger than fiction সত্য ঘটনা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। ভালবাসার মত এমন প্রচন্ড অনুভূতির ও এত বহুমুখী ফলাফল প্রদানকারী বিষয় আছে বলেই জীবন এত বিচিত্র ধরণের অর্থ বহণ করে, পরিপূর্ণতা পায় এবং মানুষ বেঁচে থাকার প্রেরণা লাভ করে। এর জন্যই আমরা ভেতরে বাহিরে সবচেয়ে বেশী আলোড়িত হই।
তাই নিরেট সত্যকে তুলে ধরলে আপন ও ঘনিষ্ঠ জন যদি ভুল বুঝে, অন্যায় বিচার করে কিংবা খারাপ ধারণা করে তবে তা অনেকেরই মনঃকষ্টের কারণ হবে। গোপন কিংবা sensitive বিষয় প্রকাশ করার কারণে কাউকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা কিংবা কারো সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটা কারোরই কাম্য নয়। তাই সব কিছু ব্যক্ত করা সম্ভবও নয়, তার প্রয়োজনীয়তাও নেই। আর ভালবাসার মত একটি বিষয় যা খুব বেশী sensitive, সীমাহীন গভীর, সকল ব্যক্তিকে বেষ্টনকারী, সে ব্যাপারে যতটুকুই প্রকাশ করা হোক না কেন, তা অনেক কমই হবে। তবে যে অনুমান করে নিতে পারে, যার অনুধাবন ক্ষমতা প্রবল, তার কাছে কোন কিছুই গোপন নয়, অজানা নয়, আশ্চর্যজনক নয়, এবং অসম্ভব নয়।
তাই গোপনটুকু গোপনই থাক, যেটুকু সবাই মিলে share করা সম্ভব, সেটুকু সবাই share করি এবং বেজার হওয়ার পরিবর্তে আনন্দিত হই। ভালবাসা দিবসে সকলের জন্য অজস্র ভালবাসা।
১৩)
গোপন সত্য
গিন্নির সাথে গল্প হাসি ঠাট্টা করতে করতে মাঝে মাঝে বলি যে, 'সত্যি কথা বললে অধিকাংশ লোকই বেজার হয়।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।