আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান অনুযায়ী মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হলো মহত্ত্ব, মেধা ও মানবিক গুনাবলীর উৎকর্ষ সাধনের মধ্যে। এই শ্রেষ্ঠত্ত্ব জগতের স্বল্পসংখ্যক চিন্তাশীল ও অনুভুতিসম্পন্ন ব্যক্তিই অর্জন করতে পারে এবং বিষয়টা অনুধাবন করতে পারাই মনে হয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হলো ৮৭ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে তবলীগে চিল্লায় (৪০ দিনের ধর্মীয় সফরে) যাওয়া। তবলীগ এক ধরণের সংস্কারমূলক আন্দোলন বা মেহনত যার উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা এই মেহনতে অংশগ্রহণ না করে ততটা উপলদ্ধি করা সম্ভব নয়। যারা গিয়েছেন তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক সচেতন ব্যক্তিই সামান্য পরিমাণে বুঝতে পারেন জীবনের উদ্দেশ্য কত মহৎ, ব্যাপক, সুদূরপ্রসারী এবং সেটা কত সুশৃংখল এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে কাটানো যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, আমার অভিজ্ঞতা থেকে এখানে যেইটুকু কথা লিখছি সেটাও অন্ধের হাতি দেখার মতই হবে । আমি যেই কথা বলতে চাচ্ছি তার জন্য কিছুটা ভুমিকার প্রয়োজন। তাই একটু ধৈর্য ধরে লেখাটি পড়ার আবেদন করছি ।

বিংশ শতাব্দিতে আমরা দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি। মানবজাতির উপর এটম বোমা বর্ষিত হতে দেখেছি। মুসলমানে মুসলমানে, মুসলমানে-অমুসলমানে এবং অমুসলমানে-অমুসলমানে অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহ, লড়াই আর মারামারি কাটাকাটি দেখেছি এবং এখনো দেখছি। তার সাথে এখন আবার নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। সমাজতন্ত্রের পতনের পর সবাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছিল এবং সর্বত্র এরই জয়জয়কার চলছিল। অথচ কয়েক বছর না যেতেই তাও ফুটো বেলুনের মত চুপসে গিয়েছে। সবাই এখন বিশ্বব্যাপী মহামন্দার কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত। বিশ্বে সুষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা সরকারী উদ্যোগ কোনটাই ফলপ্রসু হচ্ছে না। এ ব্যাপারে নানা জনে নানা কারণ দর্শালেও একথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, সবই ঘটেছে মুলত মানুষের নৈতিক অধপতনের কারণে। বর্তমান বস্তুবাদী সভ্যতার যুগে সীমাহীন লোভ ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রতিযোগিতার কারণে মানুষ সকল নীতি নৈতিকতা তথা ধর্মীয় মূল্যবোধের মূলে কুঠারাঘাত করতে সদা তৎপর। ভোগবাদী, মুনাফাখোরী ও মজুদদারী দর্শনের বিপরীতে পরোপকারী, কল্যাণমূলক ও শেয়ারিং চিন্তাভাবনার বিষয়টা কেবল মৌখিক জমা খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং সবাই চায় আমি আমার মত সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করি এবং অন্যে পরোপকার করুক। অথচ আল্লাহ তায়ালা আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে দুনিয়ার বুকে তার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন এবং তার উপরে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন। এই মহান ও গুরুদায়িত্বকে অবহেলা করে মানুষ আজ অধঃপতনের নিম্নতম ধাপে উপনীত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে নতুন করে আমেরিকার মত দেশ আবিষ্কার করার কোন সুযোগ নেই। অপর দেশের মানুষকে জাহাজে গরুছাগলের মত বেধে নিয়ে গিয়ে নিজ দেশে ক্রীতদাসের মত গোলামীর শৃংখলে আবদ্ধ করারও অবকাশ নেই। বিশ্ব কতটুকু বড়, সেখানে আনুমানিক কত জন লোক বসবাস করে, কি পরিমাণ সম্পদে তাদের সবার মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে এবং ন্যূনতম সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জগতের বুকে বেঁচে থাকতে পারবে তার হিসাব অত্যাধুনিক কম্পিউটারে বের করাটা দুনিয়ার বড় বড় পরিসংখ্যানবিদ ও গবেষকদের জন্য কোন কঠিন কাজ নয়। তা সত্ত্বেও বিশ্বের ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো কেবল নিজেদের পক্ষপাতমূলক আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে বিশ্বের যাবতীয় সম্পদের উপর তাদের অন্যায় দখলদারী কায়েম করার ষড়যন্ত্রে প্রতিনিয়ত লিপ্ত । সকল নিরীহ মানুষকে কি করে অধীনস্ত ও বশীভূত করে রাখতে পারে প্রতি মুহুর্তে তার স্কীম বানিয়ে চলেছে। সে জন্য প্রয়োজনে তারা যুদ্ধ বাধিয়ে দিতেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হচ্ছে না। যুদ্ধ চালাতে যত অস্ত্র ও বোমা প্রয়োজন তা বানিয়ে চলেছে। তাদের থিওরীই হলো প্রবলেম মিনস অপরচুনিটি এবং ওয়ার মিনস প্রফিট। তাই তারা ছলেবলে কৌশলে দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে দ্বন্দ্ব লাগাতে এবং তা জিইয়ে রাখতে সর্বদা সচেষ্ট। আর দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা হলো তারা শিক্ষা, ধন-সম্পদ, উপযুক্ত নেতৃত্ব সর্বোপরি নীতি নৈতিকতার অভাবে আগেও যেমন মানবেতর জীবন যাপন করছিল এখনো তেমন করছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে নিজেদেরকে জগতের বুকে শ্রেষ্ঠতম এবং আদর্শ দেশ- জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার। এদেশের মানুষ যতখানি শান্তিপ্রিয়, ধর্মভীরু, কর্মঠ আর দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য লালায়িত, ততটা খুব কম দেশের লোকের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু এধরণের লোক থাকা সত্ত্বেও দেশের যতটা অগ্রগতি হওয়ার কথা, ততটা হয়নি। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও অন্যতম কারণ হলো সঠিক নেতৃত্বের অভাব এদেশকে ভালোভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারছে না। আর জনগণ উপযুক্ত হলে উপযুক্ত নেতৃত্ব তাদের মধ্য হতেই বের

হয়ে আসবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন আমাদের জাতিকে সুশিক্ষিত কর্মী হিসাবে গড়ে তোলা। সেইজন্য নিচের ব্যবস্থাগুলো অবলম্বন করা একান্ত আবশ্যক।

১. হীনমন্যতা কাটিয়ে জগতের শ্রেষ্ঠতম জাতি হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জীবনবাজি রেখে কাজ করার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা,
২. এদেশের পুরো জনগোষ্ঠিকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করে তোলা,
৩. দেশীয় সম্পদ দ্বারা দেশকে স্বনির্ভর করে তোলা,
৪. দেশীয় পন্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং তা ব্যবহারে সকলকে উদ্বুদ্ধ করা,
৫. বিদেশী পণ্যের উপর নির্ভরশীলতা কমানো,
৬. দেশের প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলা যেন দেশের লোক দেশেই বসবাস করতে আগ্রহী হয় এবং বিদেশে এদেশের যেসব সন্তান রয়েছে, তারাও এদেশে আসার প্রতি অনীহা প্রকাশ না করে

৭. সারা বিশ্বের সকল স্থানের সকল বাংলাদেশীকে তাদের নিজেদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা এবং সবাই যেন এদেশের কল্যাণ সাধনায় নিবেদিত হওয়াকে গৌরবের বিষয় মনে করে সে ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো। তারা বিদেশে থাকাকালীন সময়ে এদেশের দুত হিসাবে এদেশের মর্যাদাকে যেন বিশ্বের দরবারে সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে যেতে পারে সে জন্য সর্বাত্মক কর্মপন্থা নিয়োজিত করা। মনে রাখা দরকার, যেসব বাংলাদেশী এদেশ ছেড়ে বিশ্বের নানান দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে সেসব দেশে অবস্থান করছে, বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতায় তারাই এদেশের সরাসরি প্রতিনিধিত্বকারী এবং তাদের প্রেরিত অর্থই এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সর্ববৃহৎ উৎস। আর যেসব বাংলাদেশীর সন্তান বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে এবং করছে তাদের যোগ্যতার দ্বারাও এদেশের উপকৃত হওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার রয়েছে। তাদেরকেও এদেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচীর প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার দ্বারা এদেশের লোকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে উন্নত করার ব্যবস্থা নেয়া

৮. বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ। এটা যেমন বাস্তব সত্য, ঠিক তেমনি আমরা উপযুক্ত ও আদর্শ মুসলিম জাতি হিসাবে জগতের বুকে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি সেটাও তেমন সত্য। আদর্শের দাবী করে আদর্শবিচ্যুত হওয়া অধিকতর দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। তাই আমাদের অনুপযুক্ততার সুযোগে অন্যেরা আমাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ পায়। সাথে সাথে শান্তির ধর্ম ইসলামও কলঙ্কিত হয়। সেজন্য আমাদের উচিত সর্বক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থী হিসাবে নিজেদেরকে গড়ে তোলা। মানব জীবনের চরমতম উদ্দেশ্য সে যেন সার্বিক সাফল্য, সুখ, কল্যাণ অর্জন করতে পারে। আর ইসলামও সেই কথাই বলে কেবল ইহজাগতিক নয়, বরং পারলৌকিক জীবনেও। তাই জীবনকে উপভোগের নামে চরম অনিয়ম, ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হওয়া পরিহার করতে হবে এবং ধর্মের নামে গোড়ামি, কুসংস্কার, অপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকেও বিরত থাকতে
হবে।




তবলীগে গিয়েই এ ব্যাপারে আমার যৎসামান্য সচেতনতা এসেছে। আমার মনে হয় যখন আমরা সকলে নিজেদেরকে জগতের বুকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদ্যোগী হব, সেটাই হবে আমাদের জাতির জীবনে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। এজন্য অবশ্যই অনেক নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি ভাবছেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। আমিও আমার ক্ষুদ্র চিন্তা-ভাবনা তাদের সাথে শেয়ার করলাম এবং সেজন্য কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি।