হসপিটাল সংখ্যাটি এমন একটি সংখ্যা যা আমার মনে হয় এ পর্যন্ত যত বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে বা লেখা চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনঘনিষ্ট। এ বিষয়ে লিখতে গিয়েই সবচেয়ে বেশি থ্রীলড অনুভব করছি কারণ হাসপাতালের সাথে নিজের জীবনের এমন কিছু স্মরনীয় ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা জড়িয়ে আছে যার স্মৃতি খুব বেশি নাড়া দেয়।
১) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ছেলেবেলার যখন থেকে স্মরণশক্তি কাজ করছে তখন থেকেই হাসপাতালের স্মৃতি হৃদয়ের মনিকোঠায় জমা হয়ে আছে। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসিএইচ) স্মৃতি। সত্যি বলতে কি ঢাকা মেডিকেলের সাথে জন্ম থেকেই সম্পর্ক। কারণ সেই হাসপাতালেই আমার জন্ম। আগেকার দিনে হাসপাতালে বাচ্চা হওয়ার সংখ্যা কম হলেও দিন দিন হাসপাতালে অধিক সংখ্যক সন্তান জন্ম নিচ্ছে। যে জন্যে এখন মানুষের জীবনের জন্ম থেকেই হাসপাতাল জড়িয়ে থাকছে।
তারপর সাত-আট বছর বয়সে সর্ব প্রথম যখন এক ঈদের দিন রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে এক সাইকেলের সাথে ধাক্কা লেগে নিজের ঠোঁট কাটলাম, তখন ঠোঁটে সেলাই দেয়ার জন্য ডিএমসিএইচ-এর ইমার্জেন্সীতে নেয়া হলো। চাঁদের মত বাঁকা সুঁইয়ের স্মৃতি আজো মনে আছে। কি যে কষ্ট পেয়েছিলাম আর চিৎকার করে কান্নাকাটি করেছিলাম তা মনে পড়লে এখনো কষ্ট পাই। কিন্তু ডিএমসিএইচ-এ সেই চিকিৎসার বদৌলতেই কাটা ঠোঁটটি সেরে ওঠে।
তারপর আরো কয়েকবার নিজের জন্য এবং আম্মার হাতে আঘাত পেয়ে তার চিকিৎসার জন্য আরো একবার ডিএমসিএইচ-এর ইমার্জেন্সীতে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছে। যদিও ডিএমসিএইচ-এর অনেক বিষয়ে অনেক সমালোচনা ও অভিযোগ রয়েছে কিন্তু তারপরও আম্মার মতে সেখানকার চিকিৎসাই সবচেয়ে দক্ষ, দ্রুত ও সস্তা এবং নিজেও তাই পেয়েছি।
২) লালমাটিয়ার সিটি হসপিটালে
২০০৭এ ভাগ্নি সারার শরীরে হঠাৎ গরম পানি পড়ে ভয়ানক রকম পুড়ে যায়। এত কষ্টকর ছিল সেই অভিজ্ঞতা যে আমরা নিজেরাই তার আলোচনা বারণ করে রেখেছি যেন তা পূণরায় মনে পড়ে মনঃকষ্টের কারণ না হয়। সারার সেই ঘটনার পরপরই পত্রিকাতেও আগুনে পোড়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি আর্টিকেল থেকে জানতে পারি যে, এই ধরণের রুগীদের সংখ্যা কত বেশি এবং তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার মত বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন হাসপাতালের সংখ্যা কত কম। বিশেষ করে এখনকার সময়ে উঁচু উঁচু দালানে অনেক সময়ই অনেকের বার্ণিং এর ঘটনা ঘটে কিন্তু তার প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করার মত জ্ঞানও আমাদের নেই। সে জন্যে সামান্য ঘটনাও অনেক বড় ধরণের ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। আল্লার অশেষ রহমত যে বাসার কাছেই লালমাটিয়ার সিটি হসপিটাল ছিল এবং বার্ণ রুগীদের সেবা প্রদান করার ব্যাপারে সেই হাসপাতালের স্পেশালাইজেশন ছিল। সেজন্যে সারা অনেক দ্রুত এবং ভালো মত সেরে ওঠে।
৩) হাসপাতালে থাকার প্রস্তুতি
বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের সেবা যত্নের জন্যে আম্মাকে এতবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে যে, যখনই কখনো হাসপাতালে যাবার জন্য আম্মার ডাক পড়ে, আম্মা তার ভ্রমণের ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যথানিয়মে ভরে নিয়ে রওয়ানা দেয়। কারণ হাসপাতালে থাকতে গেলে এমন অনেক জিনিসের প্রয়োজন পড়ে যা অনেক সময় কিনেও জোগাড় করাটা মুশকিল হয়ে যায়।
৪) ভুল চিকিৎসা
নানা একবার কোমরের হাড় ভেঙ্গে সোহরাওয়ার্দী পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। ডাক্তারের সঠিক পরামর্শের অভাবে অনেকদিন ভুগতে হয় এবং অনেক দেরিতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। আরেকবার এক আত্মীয়ের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে ডাক্তার বলেন যে, ব্রেইন টিউমার হয়েছে। এখবর শোনার পর তো পরিবারের সবাই ভয়ানকভাবে মুষড়ে পরে। পরে সিঙ্গাপুরে নিয়ে তার চেক আপ করানোর পর জানা যায় যে, তার আসলে কিছুই হয়নি।
৫) অযাচিত সেবা
কয়েক মাস আগে রাতের বেলা হঠাৎ করে পেটে প্রচন্ড ব্যথা ওঠে। সারারাত কোন রকমে কাটিয়ে সকাল সকাল আম্মাকে নিয়ে বের হই হাসপাতালে যাবার জন্য। অথচ পথে একটা রিকশাও পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ী-আসতে দেখে আম্মা থামার জন্য হাতের ইশারা করে। গাড়িিট কিছু দূর যাওয়ার পর থেমে যায়। আমরা এগিয়ে বললাম যে, হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন। তিনি পৌঁছে দিয়ে আসতে পারবেন কিনা। ভদ্রলোক আমাদের হাসপাতালে পৌঁছে দেন। তার এই সহৃদয়তা সর্বদা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
৬) হাসপাতালের চিকিৎসা
ঢাকা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে থেকে অনেক বড় বড় হাসপাতালে যেতে পারি এবং সহজেই চিকিৎসা সেবা নিতে পারি। কিন্তু নিজের গ্রামের হাসপাতালটির কথা মনে পড়লেই মনটা ব্যথিত হয়ে যায়। কারণ সেটার এমন দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা যে হাসপাতালে মানুষের চিকিৎসা হবে কি, বরং সেই হাসপাতালেরই সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন। কারো সুনজর না থাকায় হাসপাতাল ভবনের কেবল একটি কাঠামোই আছে কিন্তু সেখানে কোন ডাক্তার, নার্স কেউই নেই এবং কোন রুগীও সেখানে যায় না। বরং কষ্ট করে দুরের এলাকার সচল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রুগীদের যেতে হয়।
৭) আম্মার অপারেশন
আমাদের বৃহত্তর পরিবারের অনেক সদস্যেরই অপারেশন হয়েছে। তবে সবার আগে হয়েছে আম্মার। তাই আম্মা তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই অন্যদের অনেক ধরণের পরামর্শ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেছেন। তবে দুঃখের বিষয় তার অপারেশনের সময় এধরণের কোন সহায়তা তিনি কারো কাছ থেকে পাননি। কারো যেন সহজে অপারেশনের দ্বারস্থ হতে না হয়, সেজন্যেও তিনি সবসময় দোয়া করেন। কারণ অপারেশন হলে একজনের কতখানি শারিরীক দুর্বলতার সৃষ্টি হয়, তার প্রকৃত ভুক্তভোগী তিনি। হাসপাতালে থেকেই তার এই অভিজ্ঞতা।
৮) হার্ট টু হার্ট
শারিরীকভাবেই আমরা বেশি অসুস্থ হই এবং সেটারই চিকিৎসা করাই। কিন্তু মানসিক রোগও আজকাল অনেক ব্যাপক এবং তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাটাও দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষত এখনকার আধুনিকতার যুগে ছোট বড় সকলেই মাঝে মধ্যে মনোবৈকল্যের শিকার হন। তাই দিন দিন মানসিক হাসপাতালের সংখ্যাও বাড়ছে এবং বাড়ছে এ ধরণের রুগীদের সেবার মান বাড়ানোর প্রচেষ্টা। ঘটনাক্রমে নিজেও এধরণের দুই-একজনের সাহচর্য পেয়েছি এবং দেখেছি যে বাহ্যিক চিকিৎসা বা ঔষধ প্রয়োগের চেয়ে আন্তরিক সেবার কার্যকারিতাটাই এধরনের ব্যক্তিদের বেশি উপকারে আসে। তাই সকলের মাঝে পারিবারিক সুসম্পর্ক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত রাখাটা অত্যন্ত জরুরী যা আমাদেরকে হাসপাতালে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
৯) নবজন্মদাতা
বড়মামা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন এবং শিক্ষিত হবার গুরুত্ব যে কি, তা বেশ ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। তাই পরিবারের অনেক সদস্য সহ আরো বহুজনকে শিক্ষিত হতে উৎসাহ ও আর্থিক সহায়তা সহ সারাজীবন নানা ধরণের সহযোগিতা করে এসেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন। বড় মামার সেই সব
আশির্বাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একজন ডাক্তারি পাশ করেছেন এবং হাজার হাজার লোক তার কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠছেন। আমাদের পরিবারের সদস্যরাও তার কাছ থেকে বিশেষ যত্ন পেয়ে থাকি। অথচ তিনি যদি সময়মত বড়মামার সহায়তা না পেতেন তাহলে এদেশের আরো অসংখ্য ভাগ্যবিড়ম্বিত যুবকের ন্যয় তার যোগ্যতার বিকাশ ঘটাতে পারতেন না। এখন তিনি তার সেবার দ্বারা বহুলোকের নবজীবন দান করে যাচ্ছেন। এদেশে এখন অনেক ধনী ব্যক্তি রয়েছেন যারা আজ তাদের চিকিৎসা সেবার জন্য ভালো ডাক্তার খুঁজে থাকেন এবং তাদের দ্বারস্থ হন। তারা যদি তাদের অগাধ বিষয় সম্পত্তির দ্বারা মেধাবীদের ডাক্তার সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে বেশি বেশি এগিয়ে আসেন, তাহলে তাদেরও অনেক উপকার হয়, সাথে সাথে এই অভাগা দেশটিরও কিছু উন্নতির ব্যবস্থা হয়।
১০) লিফট
হাসপাতালে যত ধরণের সুযোগ সুবিধা থাকে বা থাকা উচিত তার মধ্যে অন্যতম হলো লিফটের ব্যবস্থা থাকা। একবার এক হাসপাতালে দেখি যে, অপারেশনের রুগীকে স্ট্রেচারে করে কয়েক তলার সিড়ি বেয়ে ওঠানো হয়। দেখে অত্যন্ত খারাপ লাগে। কারণ ব্যাপারটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং রুগীর জন্য ভীষণ কষ্টকর। কিন্তু তারপরও লিফটের ব্যবস্থা না থাকায় এইভাবেই চলতে হচ্ছে। কোন কোন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে এসি নষ্ট থাকায় রুগীদের প্রেশার পর্যন্ত উঠে যায়। অন্যান্য সমস্যাও দেখা দেয়। এছাড়া হাসপাতালের কেবিনগুলোর টয়লেট প্রায়ই মানসম্পন্ন থাকে না। যেজন্য সেখানে যেতেও ঘেন্না হয় এমনকি সুস্থ হওয়ার বদলে অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়। হাসপাতাল তৈরীর সময় ন্যূনতম কিছু সুযোগ সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এসব ব্যাপারগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা অবশ্যই উচিত।
১১) বিডিআর এ লাশ অন্বেষণ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। তাই এটুকু জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি পিলখানায় ঘটা ২/২৫ এর নির্মম হত্যাকান্ড। মানুষ তার নিচ স্বার্থসিদ্ধির জন্য কত নিচে নামতে পারে তার এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এই অপকর্ম। ঘটনাটি যতই আকস্মিক মনে হোক, নিশ্চয়ই এটা কারো না কারো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের নীলনকশার অংশ।
ফেব্রুয়ারীর ২৫ তারিখ থেকে কয়েকদিন ধরে টিভির পর্দায় যত দুঃখজনক ও কষ্টকর ঘটনা দেখলাম তার মধ্যে মনে হয় সবচেয়ে মর্মন্তুদ দৃশ্য ছিল হাসপাতালে প্রিয়জনের লাশ খুঁজে বেড়ানো। আপনজনকে শেষ এক নজর দেখতে আর শেষ কর্তব্য সম্পাদনের জন্য খুঁজে ফেরার চেয়ে মনে হয় নিজের মরে যাওয়াও অনেক শান্তির। তবু যদি হাসপাতালে শেষবারের মত প্রিয়জনকে পাওয়া যায় তাই সেখানে যাওয়া। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে কারোরই এটা প্রত্যাশা নয় তথাপি নির্মম বাস্তবতার কষাঘাতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
তাই দেখা যায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হাসপাতাল মানুষের জীবনে অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে আছে।
জীবনঘনিষ্ট
হসপিটাল সংখ্যাটি এমন একটি সংখ্যা যা আমার মনে হয় এ পর্যন্ত যত বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে বা লেখা চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনঘনিষ্ট।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি লিখুন।