১০.০৭.০৯ তারিখে হঠাৎ করে মোবাইল ফোনে একটা মেসেজ পেলাম। 'আপনার লেখা পড়ে আমাদের খুব ভালো লেগেছে। ফ্রেন্ড হতে চাই।' মেসেজের নিচে কয়েকটা ফোন নাম্বার। আমি বুঝতে না পেরে ফেরত মেসেজ পাঠালাম, 'কোথায় পড়লেন আমার লেখা?' কোন উত্তর এলো না।

মৌচাকে ঢিলে লেখা প্রকাশ হবার ব্যাপারটা প্রথমে ধরতে পারিনি। কারণ মৌচাকে ঢিল বের হয় সাধারণত মাসের ১৩/১৪ তারিখের দিকে। আর মেসেজটি এসেছে ১০ তারিখে। পরে ধারণা করলাম যে ম্যাগাজিনটি মনে হয় ছাপা হয়ে গেছে। হসপিটাল সংক্রান্ত দ্বিতীয় বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত 'জীবন ঘনিষ্ট' লেখাটি পড়েই কেউ মেসেজটি পাঠিয়েছিল।

বিশেষ সংখ্যায় লেখাটা বের হবার পর অনেকে কল করেছেন, মিস কল দিয়েছেন, মেসেজ পাঠিয়েছেন এমনকি আমার এলাকার একজন এসে দেখাও করে গেছেন। ইতিপূর্বে ১২/১৩টি লেখা প্রকাশিত হলেও ঘটনাক্রমে এই লেখার সাথেই প্রথম ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। সেটার যে এরকম রেসপন্স পাব তা ভাবতেই পারিনি। সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এটা অনেক বড় পাওয়া।

যায় যায় দিন এবং মৌচাকে ঢিলে প্রকাশিত এমন অনেকের লেখা পড়েছি, যাদের সাথে কোনদিন সাক্ষাত হয়নি, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে না। আবার আমার লেখা যারা পরেছেন, তাদেরও কারো সাথে সামনা সামনি দেখা হয়নি (যিনি এসে দেখা করেছেন তিনি ছাড়া)। অথচ মনে হয়েছে যেন সবাই কত দিনের চেনা এবং সবার সাথে কত আন্তরিক হৃদ্যতা রয়েছে। তাই মনে হয় যাদের সাথে যাদের অন্তরের টান তারা বুঝি একে অপরের হৃদয়ের খুব কাছাকাছিই থাকেন।

অনেকেই জানিয়েছেন, 'আবার আপনার লেখা পড়তে চাই।' প্রত্যুত্তরে বলেছি, সেটার নিশ্চয়তা দেয়া তো সম্ভব নয়। কারণ আমি বড় জোর লেখা লিখে প্রকাশকের কাছে পাঠাতে পারি। তারা যদি সেটাকে উপযুক্ত মনে করে ছাপায়, তবেই তা পড়া যাবে। তারপরও ব্যাপার থাকে। যেমন ইচ্ছা করলেই সবসময় লিখতে পারা যায় না, লেখা আসে না, মনোযোগে একাগ্রতা থাকে না। তবুও লেখার চেষ্টা করব।

একটা গানের কলি প্রায়ই মনে পড়ে-
'জীবনের গল্প
আছে বাকী অল্প।'
বানিয়ে গল্প লেখার মত সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারিনি। তাই লেখালেখিতে এই স্বল্প দৈর্ঘ্য জীবনের কিছু ঘটনাই তুলে ধরতে চেষ্টা করি। অথবা নিজে নিজে ভেবে কিছু হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে, অনুধাবন করতে পারলে তা লিখতে চেষ্টা করি।

ইচ্ছে ছিল এবারের ঈদ সংখ্যার জন্য খুব ভালো একটি লেখা লিখব। শুরুও করেছিলাম। কিন্তু শেষ করতে পারলাম না। দুঃখজনক কারণটা ঈদের খুশির আমেজে যদিও প্রকাশ করতে চাচ্ছিলাম না, তবুও লিখছি। দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার পর সন্তান লাভের সম্ভাবনা এসে হাজির হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। তাই হৃদয় বিকল হয়ে লেখার সব প্রেরণাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। এমন মানসিক বিপর্যয়ের সময়ে একজনের ফোন কলের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আবার লিখতে বসি।

আমার লেখাটি প্রকাশের ৩-৪ দিন পরই এক কিশোর বয়সী ছেলে আমাকে ফোন করে। ছেলেটি উত্তর খান থেকে অন্য একজনের ফোনের মাধ্যমে কল করেছিল। বলল, সে হাসপাতালে ছিল বেশ কয়েকদিন। সে

প্রথম মৌচাকে ঢিল ম্যাগাজিনটি পড়ে এবং তার কাছে খুব ভালো লাগে। আমার লেখাটি পড়ে আমাকে কল করেছিল। কল করার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালাম। দু-চারটে কথার পর যথারীতি জিজ্ঞাসা করলাম, সে লেখালেখি করে কিনা। বলল যে সে লিখতে পারে না। আমি বললাম, তার অবশ্যই লেখা উচিত। চেষ্টা করলেই পারা যায়। সে তখন জানালো যে তার ব্লাড ক্যান্সার। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, ইনশাল্লাহ আল্লাহ তোমাকে ভালো করে দেবে। তুমি লিখতে পারবে।

জানি না ছেলেটির কি অবস্থা। সে কিছু লিখেছে কিনা। কিন্তু তার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় নিজের শোক কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলো।

আসলে আমাদের অধিকাংশেরই অনেক দুর্বলতা রয়েছে, কষ্টের কারণ রয়েছে। তারপরও জীবনে সুখের ঢেউ এসে উপস্থিত হয়। ঘটনার পালাবদলে বেদনার জ্বালা কমে আসে। অনেক দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাই। তাই আবার আশায় বুক বেঁধে পথ চলি।

হিন্দী কোরা কাগজ সিনেমাতে গাওয়া কিশোর কুমারের সেই বিখ্যাত গানের শেষ পংতিগুলো মাঝে মাঝে মনে পড়েঃ

'দুখকে অন্দর সুখকা সাগর, দুখহি সুখকা জ্ঞান
দরদ স্যাহ কর জনম লেতা হর কোয়ি ইনসান,
ও সুখি হ্যায় যো খুশিসে দরদ স্যাহ গ্যায়া
সুখকা সাগর উসকে জীবন বনকে র‍যাহ গায়া।'

যার অর্থ অনেকটা এরকম ৪-

দুখের মাঝেই সুখের সাগর, দুঃখই সুখের জ্ঞান
ব্যথা সহ্য করেই মানুষ লাভ করে তার জীবন,
ঐ ব্যক্তিই সুখী যে খুশির সাথে কষ্ট সহ্য করল
তার জীবনই সুখের সাগরে রূপান্তরিত হলো।