ভয় নিয়ে কি লিখব ভাবতে ভাবতেই লেখা জমা দেয়ার শেষ তারিখ চলে এলো। ভয় পেলাম যে, এবার সত্যি সত্যিই লেখা জমা দেয়ার তারিখ পার হয়ে যায় নাকি। কারণ যখন থেকে লেখা পাঠাচ্ছি, তখন থেকেই এই আশংকায় ভুগি যে, সময়মত এবং জায়গামত লেখা পৌছাতে পারব কিনা। তাই প্রায় প্রতি বারই জমা দেয়ার শেষ তারিখ রাতে নিজ হাতে লেখা পৌঁছে দিয়ে আসতাম। ডাকে পাঠালে চিঠি কোথায় কখন পৌছাবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। তাই আর দেরী না করে লিখতে বসে গেলাম।

ছোট বেলায় বাচ্চারা নানান বিষয়ে ভয় পায়। আমিও পেতাম। যেমনঃ
১) রাতে কারেন্ট চলে গেলে কিংবা বটগাছের কাছে গেলে ভুতের ভয়।
২) বাবা-মার তহবিল থেকে ২/৪ টাকা সরিয়ে ফেললে ধরা খাওয়ার ভয়।
৩) মাঠের পাশে জংলা জায়গার গেলে সাপ-বেজীর ভয়।
৪) কারো মাথার সাথে নিজের মাথা বাড়ি খেলে শিং ওঠার ভয়। তাই আরেকবার নিজেরাই বাড়ি দিয়ে নিতাম যেন শিং না
ওঠে। (প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী দ্বিতীয় বাড়ি দিয়ে নিলে আর শিং ওঠে না।)
৫) পেটের ভিতর কোন ফলের বিচি (বিশেষ করে তরমুজের) চলে গেলে গাছ হয়ে যাওয়ার ভয়।
৬) নিজের বড় কোন কোন আত্মীয়ের কাছে যেতে ভয় পেতাম কারণ বাচ্চাদেরকে জ্বালানোর জন্য তাদের কৌশল ছিল
পেছন থেকে টান দিয়ে প্যান্ট নামিয়ে দেয়া।
৭) ঢাকনা ছাড়া ম্যানহোলে পড়ে যাওয়ার ভয়।
৮) স্কুলের বই-খাতা হারিয়ে ফেললে আম্মুর বকা খাওয়ার ভয়।
৯) তেলাপোকা ও ইঁদুরের ভয়।
১০) দাবা খেলতে বসলে হেরে যাওয়ার ভয়। (কারণ এর চাল কিছুতেই হিসাব করে ধরতে পারতাম না।)
১১) কোন বড় বিল্ডিংএর ছাদে উঠলে নিচের দিকে তাকানোর ভয়।
১২) সকেটে কিংবা বিদ্যুতের খুঁটিতে হাত দিয়ে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার ভয়।
১৩) কই মাছ খাওয়ার সময় গলার কাটা ফুটে যাওয়ার ভয়।
১৪) কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয়।
১৫) শবে বরাতের সময় পটকা আতশবাজী ফুটানোর সময় আহত হওয়ার ভয়।
১৬) রাস্তায় ভীড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়।

বড় হয়ে জেনেছি যে, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায় এবং The only thing to fear is fear itself (President Roosevelt at the time of Great Depression)। এখন আর তেমন কোন কিছুতেই ভয়-টয় লাগে না। কারণ আমার মতে মানুষের জীবনে প্রধান যে তিনটি ভয়ের কারণ রয়েছে, তা এরই মধ্যে অতিক্রম করে এসেছি। এক নম্বরে ছাত্র জীবনে ফেল করার কিংবা নিদেন পক্ষে কোন বিষয়ে লাল দাগ পাওয়ার ভয়। মাষ্টার্স শেষ করে এসে সে তয় আর নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে কামাই রোজগারের দুশ্চিন্তা বা ভর দুই নম্বরে। বেকার থাকার অবমাননা এবং লাঞ্ছনা-গঞ্জনার আতংকে কতজনকে জীবন বিসর্জন দিতে দেখলাম। চাকরি নামের সোনার হরিণের দেখা পেয়ে সেই ভয়ও দূর হলো। সত্যি বলতে কি কর্মজীবনে এসে সবার সাথে নিজের পারদর্শিতা ও যোগ্যতা তুলনা ও যাচাই করে যেই আত্মবিশ্বাস পেয়েছি, তাতেই জীবনের সব ভয় দুরীভূত হয়েছে। কারণ অধিকাংশকেই দেখি অদক্ষ, আর যারা দক্ষ তারা কাজ করতে চায় না বরং ফুটানি করে বেড়ায়। তাই কাজ করার যে যোগ্যতা ও সামর্থ নিজের রয়েছে, তাতে দুবার চাকরি বদলে এখন তৃতীয় চাকরি করছি। সেই সাথে এও জানি যে, যদি চাকরি চলে যায়, নিজের চেষ্টার দ্বারা আরেকটা সুযোগ সৃষ্টি ও চলার ব্যবস্থা করে নিতে পারব ইনশাল্লাহ।

জীবনের তৃতীয় বা শেষ বড় ভয় মনে হয় বিয়ে। কাকে জীবন সঙ্গী হিসাবে পাব, যার সাথে চলব, সে কতটা সুখী করবে বা তাকে কতখানি সুখী করতে পারব, এই ভাবনা অজানা গন্তব্যের পথিকের জন্য নিতান্তই স্বাভাবিক। তাই এই ভয় বিয়ে করেই ভাঙ্গল। বিয়ের আগে অতিরিক্ত দুর্ভাবনায় যেমন সবচেয়ে বেশি শুকিয়ে গিয়েছিলাম, তেমনি বিয়ের পর আশাতীত

ভাল জীবনসঙ্গী পেয়ে এবং শ্বশুড়বাড়ীর প্রচুর আপ্যায়নে সবচেয়ে বেশি ফুলে গিয়েছিলাম। এখন আল্লাহর রহমতে মধ্যম অবস্থায় আছি।

বিয়ের ব্যাপারে নিজের আরেকটা আশংকার কথা তুলে ধরেই লেখাটি শেষ করছি। ছোট বেলার এক ঈদের দিনে রাস্তায় সাইকেলের সাথে ধাক্কা লেগে নিচের ঠোঁটের এক পাশ খানিকটা কেটে যায়। বাসায় লুকিয়ে ঢুকে বার বার কুলি করেও থামাতে পারছিলাম না। কলকল করে রক্ত ছুটতে দেখে অনেক ভয় পেয়ে যাই। কারণ আব্বা-আম্মা দেখলে নির্ঘাত বকা দিবে। অবশ্য একটু পরে তারা জানতে পেরে তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। কাটার কারণে সেলাই দিতে হয় এবং সেই থেকে সেখানে জ্বরঠোসের মত একটা দাগ পারমানেন্ট হয়ে যায়।
এরপর থেকে অনেকের সাথে দেখা হলেই জিজ্ঞাসা করে যে, কি ব্যাপার? জ্বর হয়েছে নাকি? জ্বরঠোস দেখা যাচ্ছে। আমাকে বুঝিয়ে বলতে হয় যে, এটা জ্বরঠোস না। ছোট বেলায় কেটে যাওয়ার সেলাইয়ের দাগ।
বড় হবার পর মাথায় চিন্তা আসত, বিয়ের সময় পাত্রী যদি দেখে যে, ছেলের ঠোঁট কাটা এবং দাগটা পারমানেন্ট, তাহলে কি রিঅ্যাকশন হবে। তাই চিন্তা করলাম যে, নিজের থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলার দরকার নেই। সামনাসামনি দেখার সময় যদি কেউ কিছু জানতে চার, তাহলে বলব। কেউ কিছু জানতে চাইল না। বিয়েও হয়ে গেল।
বিয়ের রাতে দুচারটে কথার পরই নববধুকে জানিয়ে দিলাম যে, ঠোঁটের দাগটি আসলে জ্বরঠোস নয়। সেলাইয়ের দাগ। কারণ বউয়ের সাথে ক্লোজ হবার সময় যদি সে মনে করে যে, শারীরিকভাবে অসুস্থ, তাহলে তা নিতান্তই বিব্রতকর হবে। বিশেষ করে এমন জায়গায় যদি অসুস্থতা থাকে। জানিয়ে দেয়ার কোন সমস্যা হলো না।

এখন অনেক দিন পরে মাঝে মধ্যে এ ব্যাপারে কথা উঠলে গিন্নী বলে যে, সে সত্যি সত্যিই সেটা জ্বরঠোস ভেবেছিল এবং আমার উপর ভিষণ ক্ষেপেছিল এই জন্য যে, জ্বরঠোস নিয়ে কেউ পাত্রী দেখতে যার নাকি? আর বিয়ের আগে যদি এই পারমানেন্ট দাগের কথা জানতে পারত, তাহলে আদৌ বিয়ে হতো কিনা তা সন্দেহমুক্ত নয়। অবশ্য এখন সে বলে যে আমার যেন কোন সময় নজর না লাগে, সে জন্য আল্লাহ তায়ালা একটা পারমানেন্ট নজর টিপ দিয়ে দিয়েছেন। ধন্যবাদ উপরওয়ালাকে এবং গিন্নীকে।